About Canal Road Samaj Seva Samiti
পুরোনো কলকাতার একটা প্রবাদ আছে, মা দুর্গা নাকি মর্তে এসে গয়না পরতে যান জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়িতে। ভোজন করতে যান কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে। আর সব শেষে রাত জেগে নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ঘাঁটলে খুঁজে পাওয়া যাবে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাকে হারানোর পর বিজয়োৎসব পালন করতে খোদ লর্ড ক্লাইভ কলকাতা রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। শহর কলকাতার পুজোর ইতিহাসের ভিত তৈরি সেখান থেকেই। আর বছরের এই পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ ঘিরে আনন্দ করার জন্যই সারাবছর পরিশ্রম করে চলেছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী স্মৃতিবিজড়িত ক্লাব ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতি।
কলকাতায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল রাজা নবকৃষ্ণদেবের হাত ধরে। কিন্তু বারোয়ারি পুজো! যাকে ঘিরে আমাদের এত উন্মাদনা? অতীতে গুপ্তিপাড়ায় দুর্গাপুজোর সময় এক জমিদার বাড়িতে অপমানিত হতে হয়েছিল গ্রামবাসীদের। এরপরই ১২ জন বন্ধু মিলে বিন্ধ্যবাসিনী বারোয়ারি পুজো শুরু করেছিলেন। শহর কলকাতায় প্রথম বারোয়ারি পুজো অনুষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে। এরপর ১৯১১ সালে সর্বসাধারণের জন্য হাতিবাগানে প্রথম চাঁদা তুলে দুর্গাপুজো শুরু হয়। তখনকার এই বারোয়ারি পুজোগুলি ছিল মূলত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মঞ্চ। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতি। বলাই বাহুল্য বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল ক্লাবের চার দেওয়ালের ঘরটি। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান রয়েছে এই ক্লাবের নেপথ্যে। যাদের মধ্যে অন্যতম স্বর্গীয় তারানাথ গাঙ্গুলি। সেই ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছিলেন স্বর্গীয় মনোরঞ্জন রায়, স্বর্গীয় বিশ্বনাথ ব্যানার্জী, স্বর্গীয় শঙ্কর দাস, স্বর্গীয় শচীন সরকার, স্বর্গীয় অতুল দত্ত, স্বর্গীয় বিজয় মুখার্জী, স্বর্গীয় মণি মিত্র, স্বর্গীয় চিত্ত বিশ্বাস, স্বর্গীয় রমেশ বিশ্বাস, স্বর্গীয় সন্তোষ দাস, স্বর্গীয় সুরেন দত্ত সহ একাধিক।
১৯৩৭ সালে কলকাতার বুকে শুরু হয় দশদিন ব্যাপী দুর্গাপুজো। যেখানে প্রধান পুরোহিত সহ এগারো জন পুরোহিত বসতেন পুজো করতে। কিন্তু সেখানে আসল পুরোহিত থাকত একজনই আর বাকি দশজন থাকতেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁরা পুজোর আসনে বসে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কৌশল তৈরি করতেন। দেবী দুর্গার স্বদেশী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠার পিছনে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস আনন্দমঠেরই নাকি মূল ভূমিকা ছিল। পরে অবশ্য স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ক্রমেই হাঁফ ছেড়ে বেঁচে থাকার উৎসব হয়ে ওঠে ক্লাবের দুর্গাপুজো। স্বর্গীয় অসীম ব্যানার্জী, স্বর্গীয় মনা দত্ত, স্বর্গীয় অশোক ব্যানার্জী, স্বর্গীয় দিবাকর পাখিরা সহ বহু মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন ক্যানেল রোডের পূজাপার্বনে। বর্তমানে যারা এখনও আমাদের অভিভাবকের মতো পুজোর সমস্ত অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বিষয়ে দিশা দেখান তাঁদের মধ্যে অন্যতম শম্ভু রায়, হেমলাল ঘোষ, বাবু সরকার, তপন রায়, রতন দত্ত, শম্ভু সাহা ও অরুন দাস।
নতুন পুজো, নতুন থিম, পুজোকে আরও জমকালো করেছে বঙ্গজীবনে। জাঁকজমক চমকে-চমকে দেয় উৎসবকে। পুরোনো পুজো অত আলো পায়নি কখনও। কিন্তু নতুন পুজোর দিনগুলোতে অপ্রত্যাশিত অতিথি আসে না। না বলে-কয়ে ওভাবে চলে আসার দস্তুর নেই যে। আর এই জাঁকজমক-চমকের মাঝেও এক পুজো পাগলের দেখা মিলেছিল দস্তুরের মতো। পরিমল দে। তাঁর পুজো শুরু হয়ে যেত এক বছর আগে থেকেই। পটুয়া পাড়ায় আনাগোনা থেকে শুরু করে পুজোর ভাবনা, সারা বছরটাই ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতির পূজাপার্বনের কাউন্টডাউনে কাটিয়ে দিতে পারতেন তিনি। ভরদুপুর হোক বা মাঝরাত্তির, পুজোর জন্য পুজো পাগলের বাড়ির সদর দরজায় কখনও খিল পড়ত না।
দেবীর মর্তে আগমন শুধু তো ধর্মীয় উৎসব নয়, বছরের এই পাঁচ দিন শহরের আনাচে-কানাচে যে সমসাময়িক শিল্পের নিদর্শন দেখা যায়, তা তুলনাহীন। ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতির পুজোয় যে শিল্পীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে শূন্য থেকে একটি মণ্ডপকে তার সম্পূর্ণ রূপ দিচ্ছেন, তাঁদের কাজের সঙ্গে বাংলার চলচ্চিত্র সম্ভারের সংযোগ অনস্বীকার্য। চলচ্চিত্র আজ সমগ্র পৃথিবীর পরম বিস্ময়। সমাজের প্রতিটি স্তরে চলচ্চিত্রের প্রভাবও আজ সুদুরপ্রসারী। ভগবানের অপূর্ব সৌন্দর্য-সৃষ্টির প্রতীক ফুল ভালোবাসেন না এমন লোক পৃথিবীতে যেমনি বিরল-তেমনি চলচ্চিত্রকে স্বীকার করেন না, এমন মানুষের সংখ্যাও বিরল। আর এই সৌন্দর্য-সৃষ্টিকে তুলে ধরতেই ৪৩ তম বছরে ‘অবাক সবাক ছবির ঘর’-এর দেখা মিলবে ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতির পুজোয়।
তথ্য খুঁজলে দেখা মেলে প্রথম ভারতীয় পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র রাজা হরিশচন্দ্র। দাদাভাই ফালকের প্রযোজনায় ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জনক ফালকের অন্যান্য চিত্রগুলির মধ্যে নাম করা যেতে পারে, 'কালীয়াদমন', 'শ্রীকৃষ্ণজন্ম', 'লঙ্কাদহন' প্রভৃতির। ভারতের সর্বপ্রথম সবাক চিত্র ইম্পিরিয়াল ফিল্ম কোম্পানি কর্তৃক ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বম্বেতে গৃহীত আলমআরা। বাংলায় সর্বপ্রথম সবাক চিত্র জামাইষষ্ঠী, ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল ক্রাউন সিনেমায় মুক্তিলাভ করে। আর এই চলচ্চিত্রের প্রযোজনা করে ম্যাডান কোম্পানি আর পরিচালনা করেন স্বর্গত অমর চৌধুরী। এমনই সব তথ্য ও চলচ্চিত্র নির্মানের যন্ত্রপাতির জমাটি পার্বনে ক্যানেল রোড নজর কাড়তে চলেছে আপামর শহরবাসীর। নতুন আঙ্গিকের থিম পুজোয় হ্যাট্রিক করে ফের ময়দানে নেমেছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ক্লাব। একটি পাড়া-একটি পরিবার। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নানান সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে দিনগুলো।
২০২২ নতুন আঙ্গিকে থিম পুজোর অন্যতম বছর। ঠাকুরবাড়ির দালানকোঠার সেকেলে চিত্রকে তুলে ধরা হয় ‘কালের স্রোত’ নাম দিয়ে। সে বছর বিশ্ববাংলা পুজো সম্মানে সম্মানিত হয়েছিল ক্যানেল রোড সমাজ সেবা সমিতি। যে কারণে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। কাট টু ২০২৩, রথযাত্রাকে সামনে রেখে ‘অশ্বরথ’ এবং ২০২৪ -এ নারীশক্তিকে সম্মান জানিয়ে ‘শ্রীক্ষয়’ থিমকে কেন্দ্র করে পুজো হয়। যেখানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সাহসী নারীদেরকে আমরা পাশে পেয়েছিলাম। পুজোপ্রেমী বাঙালির কাছে মহালয়া মানেই পুজো শুরুর দিন। আজ আমাদের দুর্গাপুজো লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। স্বাধীনতার আগে থেকে আজ পর্যন্ত নানা বাঁকবদলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে দুর্গাপুজো। সে উৎসবের রূপ-রঙ-আমেজ বদলেছে নানা সময়ে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও প্রানের টান অটুট রয়েছে। মহা মিলনের সুরটুকু অটুট রয়েছে। ঠিক যেমন, রোদ্দুর বেয়ে পাড়ি দেয় ঘুম পাহাড়ের দ্বীপ! কাপাসতুলো-মেঘে যেখানে আলতো হাসে খুশিয়াল ডাকটিকিট।
Our Accolades
Biswa Bangla
Shared Samman Awardee 2021, 2022, 2023 & 2024
Kolkata Shree Pujo
Shared Samman Awardee 2021, 2022, 2023 & 2024
Our Route Map